শিক্ষার্থীর বৃদ্ধি ও বিকাশের ধরন সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন Bed 1st Semester Question Answer

শিক্ষার্থীর বৃদ্ধি ও বিকাশের ধরন সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

শিক্ষার্থীর বৃদ্ধি ও বিকাশের ধরন সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন Bed 1st Semester Question Answer


সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান ৫)


[উ] জন্মের পর শিশুর বৃদ্ধি কীভাবে ঘটে সে সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষণা থেকে মনোবিজ্ঞানীরা বৃদ্ধির যে বৈশিষ্ট্যগুলি নির্ণয় করেছেন সেগুলি হল-

[১] বংশগতি ও পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ার ফলে শিশুর বৃদ্ধি ঘটে।

[২] জন্মের পর থেকে শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির হার বিভিন্ন বয়সে কখনও বাড়ে, আবার কখনও কমে।

[3] জন্ম থেকে আড়াই বছর বয়স পর্যন্ত দৈহিক বৃদ্ধির হার খুব দ্রুত হয়।

[4] আড়াই বছর বয়স থেকে বারো কিংবা তেরো বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির হার খুব কমে যায়।

[5] পনেরো-ষোলো বছর বয়সে অর্থাৎ কৈশোরে দৈহিক বৃদ্ধির হার আবার বেড়ে যায়।

[6] মেয়েদের আঠারো এবং ছেলেদের কুড়ি-একুশ বছর বয়স পর্যন্ত খুব ধীরে হলেও দৈহিক বৃদ্ধি ঘটতে থাকে।

[7] পুষ্টিকর খাদ্য, উপযুক্ত পরিবেশ এবং অভ্যপ্রত্যঙ্গোর পরিচর্যার উপর শিশুর স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি নির্ভর করে।

[8] প্রত্যেক শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি একই হারে ঘটে না। কারও দৈহিক বৃদ্ধি দ্রুতগতিতে ঘটে, আবার কারও দৈহিক বৃদ্ধির গতি ধীর।

[9] প্রত্যেক শিশুর বৃদ্ধি তার নিজস্ব গতিতে চলে।

[10] একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুর বৃদ্ধি নিরবচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিকভাবে ঘটে।

[11] আবহাওয়ার উপরও বৃদ্ধি নির্ভর করে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেঙ্গ বৃদ্ধির হারের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

বিকাশের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ (General Characteristics of Development)

বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে মনোবিদগণ বিকাশের যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি নিরুপণ করেছেন তা নিম্নরূপ-

অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া : বিকাশ জীবনকালব্যাপী একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। মাতৃগর্ভে ভূণ সম্মারের মুহূর্ত থেকে আমৃত্যু এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন চোখে পড়ে না। তবে এই পরিবর্তন ব্যস্তির ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে নষ্ট করে না। বিকাশের ধারায় এক পর্যায় থেকে আর-এক পর্যায়ে উন্নীত হওয়াটিও কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বিকাশের প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবেই এগিয়ে চলে।

ক্রম-সংযোজনশীল প্রক্রিয়া : বিকাশ একটি রুমসংযোজনশীল প্রক্রিয়া অর্থাৎ ব্যস্তির বিকাশের যে-কোনো একটি পর্যায় তার পূর্ববর্তী সকল পর্যায়ের বিকাশের সমষ্টির ফল। ব্যক্তিজীবনে বিকাশ কোনো বিশেষ মুহূর্তে হঠাৎ করে আসে না। বিকাশের যে-কোনো পর্যায় তার পূর্ববর্তী পর্যায় থেকেই আসে।

সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রক্রিয়া : বিকাশের ধারা সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ কোন্ আচরণের পর কোন্ আচরণ হবে তা মোটামুটি নির্দিষ্ট। যেমন প্রত্যেক মানবশিশু প্রথমে উপুড় হবে, তারপর বসবে, তারপর হামাগুড়ি দেবে, তারপর হাঁটবে। এই নিয়মানুবর্তিতা প্রায় প্রত্যেক শিশুর ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায়।

পৃথকীকরণ অভিমুখী প্রক্রিয়া : বিকাশ পৃথকীকরণ অভিমুখী প্রক্রিয়া অর্থাৎ সাধারণ থেকে বিশেষের দিকে অগ্রসর হয়। যেমন-মানবশিশু জীবনের প্রথম পর্যায়ে যে-কোনো প্রতিক্রিয়া করার জন্য সমগ্র দেহ কাঠামোকে ব্যবহার করে কিন্তু জীবনবিকাশের পথে সে যতই অগ্রসর হয়, ততই সে তার দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যলাকে বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারে।

শৃঙ্খলিত প্রক্রিয়া : মানবজীবনের বিভিন্ন দিকের বিকাশের মধ্যে একটি শৃঙ্খলা বজায় থাকে। একদিকের বিকাশ অপর দিকের বিকাশে সহায়তা করে। যেমন-দৈহিক বিকাশ মানসিক বিকাশকে প্রভাবিত করে, আবার মানসিক বিকাশ সামাজিক বিকাশে সহায়তা করে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে সমস্ত ধরনের বিকাশই ব্যক্তিজীবনে একটি শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলে।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অভিমুখী প্রক্রিয়া : বিকাশের প্রক্রিয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অভিমুখী। সাধারণভাবে বিকাশ বিশেষ বয়সের ক্ষেত্রে কতকগুলি সাধারণ নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু পরিণত ব্যক্তিজীবনে তা বিশেষ রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ প্রত্যেকটি শিশুর ক্ষেত্রে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই বিকাশ ঘটে।


[উ] সাধারণত দারিদ্র্য বলতে যে বিষয়গুলি বোঝায় সেগুলি হল-

[1] জীবনযাপনের সমাজভিত্তিক স্বাভাবিক মানের অভাব।

[2] জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বিষয়, যেমন-খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় মাত্রায় সংগ্রহ করতে না পারা।

[3] অর্থ, জমি, ঋণ ইত্যাদি আহরণে অসমর্থ।

[4] সম্পদের অভাবে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন ও তা রক্ষার অক্ষমতা।

[5] নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে হতাশাগ্রস্ত অবস্থা।

সুতরাং শিশুর সুষম বিকাশের পথে একটি বিরাট বাধা হল দারিদ্র্য। শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের উপর দারিদ্র্যের প্রভাব নিম্নরূপ-

[1] দরিদ্র পরিবারের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের অন্তরায়।

[2] দারিদ্র্যের প্রধান প্রভাব পড়ে শিশুদের দৈহিক সুষম বৃদ্ধির উপর। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা সঠিক পুষ্টিকর খাবার পায় না। ফলে দরিদ্র পরিবারের বেশিরভাগ শিশুই অপুষ্টিতে ভোগে।

[3] অপুষ্টিজনিত রোগের ফলে শিশুর মধ্যে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে ওঠে না।

[4] প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন বয়সে শিশুকে যে প্রতিষেধক (টিকা) দেওয়া প্রয়োজন দরিদ্র পরিবার অনেক সময় তারও ব্যবস্থা করতে পারে না। অর্থাৎ দারিদ্র্যতা শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি ও বিকাশের উপর প্রত্যক্ষভাবে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে।

[5] দরিদ্র পরিবারের বেশিরভাগ পিতামাতা উভয়েই উপার্জনের জন্য নিযুক্ত থাকেন। তারা শিশুর ন্যূনতম পরিচর্যা করারও সময় পান না। ফলে তাদের শিশুরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করে এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে যা শিশুর মানসিক, সামাজিক ও প্রাক্ষোভিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।

[6] হীনম্মন্যতা, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, ক্ষমতাহীনতা ইত্যাদি শিশুর মধ্যে বাসা বাঁধে।

[7] আত্মনিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ, কৌতূহল, ভাষা, প্রেষণা, পেশির ব্যবহার ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা তৈরি হয়। ফলে সুস্থ সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

[8] দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অনেক সময় তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। চুরি করা, মিথ্যে কথা বলা, ইত্যাদি নানা সমস্যা দেখা যায়।

[9] বিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষাগ্রহণের জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি শিশুর প্রয়োজন তা থেকেও তারা বঞ্চিত হয়।

[10] দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবোধের অভাব থেকে নানাপ্রকার অপরাধমূলক আচরণ করে থাকে। সুতরাং দারিদ্র্যতা শিশুর দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক, সামাজিক ইত্যাদি নানা দিকের বিকাশের উপরই নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। তবে পরিবারে শৃঙ্খলা থাকলে অভাববোধ বা প্রাচুর্য কোনোটাই শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না।


[উ] বৃদ্ধি ও বিকাশের মধ্যে পার্থক্যগুলি হল-

বৃদ্ধিবিকাশ
1. আকার ও আয়তনে বেড়ে যাওয়াকেই বৃদ্ধি বলে।1. আকার ও আয়তন বৃদ্ধির সলো সক্রিয়তা এবং কার্য সম্পাদনে উৎকর্ষতা বিকাশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
2. বৃদ্ধি হল কারণ।2. বিকাশ তার ফল।
3. বৃদ্ধির ধারণা কেবল দৈহিক বা শারীরিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।3 বিকাশের ধারণায় দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, প্রাক্ষোভিক সবই অন্তর্ভুক্ত।
4. বৃদ্ধি স্বতঃস্ফূর্ত, তবে অনুশীলনের প্রভাব দেখা যায়।4. পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলেই বিকাশ ঘটে অর্থাৎ ব্যক্তির সক্রিয়তা এবং অনুশীলন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
5. বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনুশীলন ‘বিশেষ’ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট, যেমন হাতের পেশির ব্যায়াম করলে হাতের পেশির বৃদ্ধি হবে, পায়ের পেশির উপর এর প্রভাব নেই।5. বিকাশ সামগ্রিক। মানসিক বিকাশের চর্চা করলে তার প্রতিফলন সামাজিক, প্রাক্ষোভিক বিকাশের উপরে দেখা যায়।
6. বৃদ্ধি একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত ঘটে।6. বিকাশ আমৃত্যু ঘটে।
7. বৃদ্ধি পরিমাপযোগ্য।7. বিকাশ পর্যবেক্ষণ-সাপেক্ষ।
৪. বৃদ্ধি পরিমাণগত।৪. বিকাশ গুণগত।
9. শিক্ষা বৃদ্ধির পরিমাণকে প্রভাবিত করলেও তা বাঞ্ছিত কিনা সে ব্যাপারে শিক্ষা-মনোবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে।9. শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হল ব্যক্তির পূর্ণ বিকাশ।

[উ] সামাজিকীকরণের মাধ্যমগুলির মধ্যে পরিবারের ভূমিকাই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়ে থাকে, শিশুর ব্যস্তিত্ব বিকাশের পথে বংশগতি কাঁচামাল জোগায়, সংস্কৃতি নকশা জোগায় এবং পরিবারে পিতামাতা কারিগর হিসেবে কাজ করেন। কারণ শিশুর দৈহিক, মানসিক, পার্থিব ও অপার্থিব যাবতীয় প্রয়োজন মেটায় পরিবার। কীভাবে কথা বলতে হবে, নিজের আবেগ কীভাবে প্রকাশ করা যায় তা শিশু পরিবার থেকে শিক্ষালাভ করে। পরিবারেই শিশু তার চিন্তা, আবেগ ও কর্মের অভ্যাস গঠন করে। পরিবারেই তৈরি হয় ব্যক্তিত্ববান কিংবা ব্যক্তিত্বহীন মানুষ।

ব্যক্তিত্ব হল কার্যকরী সম্পদ, সাফল্যের চাবিকাঠি, চৌম্বক শক্তি, অগ্রণী শক্তি, এগিয়ে নেওয়ার শক্তি, মানুষের চালনা শক্তি, একটি আদর্শ, একটি দর্শন, চারিত্রিক গুণাবলি। অন্যের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হবে, চালচলন বা ভাবভঙ্গ্যি কেমন হবে-এসব শিক্ষা প্রথম পরিবার থেকেই শুরু হয়। মা-বাবা এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে কোন্টা ঠিক কোন্টা বেঠিক এসব সঠিকভাবে শেখার ফলে কাঙ্ক্ষিত ব্যস্তিত্ব সহজেই গড়ে ওঠে। মৌলিক ব্যস্তিত্বের মধ্যে কোনো সমস্যা দেখা দেওয়ার ফলে শুধু ব্যক্তির নিজেরই নয়, আশেপাশের লোকদেরও সমস্যা দেখা দেয়। ব্যক্তিজীবনের ব্যস্তিত্বের সীমারেখা নির্ধারিত হয় কথাবার্তায়, আচার-আচরণে, চালচলনে, ধ্যানধারণায় ও মন-মানসিকতায়।

ব্যক্তিত্বহীনদের আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকে না, আত্মনির্ভরশীল হতে পারে না, পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আত্মজ্ঞান, আত্মোপলব্ধি থাকে না, আত্মবিশ্লেষণ, আত্মসমালোচনা, আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মশুদ্ধি করতে পারে না, আত্মত্যাগের মন-মানসিকতা হারিয়ে ফেলে, আত্মসম্মান করে না, মানবতা লোপ পায়, ইচ্ছা, স্বপ্নও লক্ষ্য হারায়, ভয় পায়, হীনম্মন্যতায় ভোগে, কর্মদক্ষতা হারায়, ব্যর্থ হয়। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সুনাগরিকরা শালীন ভাষা ব্যবহার করে, সবাইকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয়, মার্জিত ও স্বাভাবিক আচার-আচরণ করে, ক্রোধ-উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখে, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা গড়ে তোলে, অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না, কথা বলার সময় সুন্দর সুন্দর ভাষা ব্যবহার করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মার্জিত পোশাক পরিধান করে, হাসি মুখে কথা বলে, অতিরিক্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকে, যেখানে যেমন যথাযথ তেমন থাকে, চরিত্রবান হয়, ইতিবাচক চিন্তা করে, বাঁকা বা জটিল কথা বলে না, অন্যের কাজকর্মের প্রশংসা করে এবং ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।

শিশুর দেহ-মনের পূর্ণ বিকাশের জন্য আনন্দ, ভালোবাসা ও সমঝোতাপূর্ণ পরিবেশে তাকে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। পরিবারে ধর্মীয় রীতিনীতি, নৈতিকতা, সততা এসব বিষয় শেখাতে হবে। শিশুর সম্ভাব্য সর্বোত্তম চাহিদা পূরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিশুর সফলতার প্রশংসা করতে হবে। শিশুর অকৃতকার্যতার বিষয়গুলি বড়ো করে তুলে ধরলে শিশু হীনম্মন্যতায় ভুগবে। পরিবারে ছোটোরা বড়োদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ছোটোদের প্রতি বড়োরা আন্তরিক হলে-তা থেকেই শিশুরা এসব গুণাবলি অর্জন করবে। শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। শিশুকে গালমন্দ বা তিরস্কার করা যাবে না। ‘তোমার দ্বারা কিছু হবে না’ এমন নেতিবাচক বাক্যও শিশুকে বলা যাবে না।

শিশুর মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, শৃঙ্খলা ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য উপদেশমূলক ও শিক্ষামূলক গল্প-ছড়া শোনাতে হবে। একটি শিশুর যখন আমি-তুমি সম্পর্ক, নিজের নাম অথবা সকল বস্তু বা ব্যক্তির নাম সম্পর্কে কৌতূহলী হয় তখন থেকেই তাকে হ্যাঁ-না, ভালোমন্দ, সুন্দর-অসুন্দরের ধারণাকে সুস্পষ্ট করে দেওয়া মায়ের কর্তব্য। শিশু মায়ের পছন্দের বিষয়গুলিকে বারবার করতে পছন্দ করে, উৎসাহিত হয় এবং অপছন্দের বিষয়গুলি করে না। তাই মাকে ভালোমন্দের বিচার করে শিশুকে বুঝিয়ে দিতে হবে তাঁর পান্দ ও অপছন্দের বিষয়। মায়ের আচরণ যদি মার্জিত হয় তাহলে শিশুর ক্ষেত্রে মার্জিত ও শিষ্ট আচরণ আশা করা যায়।

সুতরাং বলা যায় যে, শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণই শুধু নয়, পরিবারের কোনো বিকল্পই নেই।


[উ] নিম্নমানের প্রতিবেশীর কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করতে পিতামাতার করণীয় বিষয়গুলি হল-

[1] দূষিত প্রাকৃতিক পরিবেশ শিশুর মনে যাতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার না করতে পারে তার দিকে নজর দেওয়া।

[2] শিশুরা যাতে কোনোভাবেই অসামাজিক কাজে লিপ্ত না হয় সেইজন্য সঠিক নির্দেশনা প্রদান করা।

[3] শিশুদের মধ্যে পারিপার্শ্বিক মানুষের যারা মূল্যবোধের অভাব হলে তাকে সঠিক উপায়ে নিরাময় করা।

[4] শিশুর নৈতিক চরিত্র যাতে ক্ষতিগ্রস্থ না হয় তার জন্য নীতিশাস্ত্র পাঠ করে তাদের নীতিজ্ঞান প্রদান করা।

[5] সমবয়সি বন্ধুদের প্রভাবে শিশুরা অনেক সময় চুরি, মিথ্যা বলা ইত্যাদির মতো অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সেগুলি থেকে শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসাও পিতামাতার করণীয় ও দায়িত্ব হয়ে ওঠে। 

নিম্নমানের প্রতিবেশীর কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করতে শিক্ষকের করণীয় বিষয়গুলি হল-

[1] শিশুদের পরিবেশের কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করা।

[2] শিশুদের অনৈতিক কাজ থেকে দূরে রাখতে তাদের মধ্যে ইতিবাচক উৎসাহদান করা।

[3] শিশুর মধ্যে উপস্থিত সকল ধরনের কৌতূহলকে নিবৃত্তি করার দ্বারা তাদের সঠিক পথ দেখানো।

[4] শিশুদের নীতি পরায়ণ হতে সাহায্য করা।

[5] শিশুদের সামগ্রিক আচরণের পরিবর্তনে সঠিক নির্দেশনা প্রদান করা।


[উ] মানুষের জীবনধারণের জন্য যা প্রয়োজন তা না পাওয়ার অবস্থাকে বলা হয় বন্দনা। অর্থাৎ শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক বিষয়গুলি থেকে কোনো না কোনো কারণে তার দূরত্ব তৈরি হওয়া। যেসব কারণে শিশু বঞ্চিত হয় সেগুলি হল-

[1] মা-বাবার স্নেহভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর দৈহিক, মানসিক ও প্রাক্ষোভিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

[2] আর্থিক ও সামাজিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর সামাজিক ও নৈতিক বিকাশ সঠিক হয় না।

[3] শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর সঠিক জ্ঞানমূলক বিকাশ ও বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটে না।

[4] সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

শিশুর বিকাশের যে দিকগুলি বঞ্চনা ও বিপর্যন্ত পরিবারের জন্য বিঘ্নিত হয় সেগুলি নীচে আলোচনা করা হল-

দৈহিক বিকাশে : শিশু যদি তার পরিবারের কাছ থেকে সঠিক পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে তার দৈহিক বিকাশ ব্যাহত হয়, অপুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং নানারকম দৈহিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। শিশু উপযুক্ত খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হলেও তার দৈহিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

মানসিক বিকাশে : শিশু মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ভালোবাসা ও মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হলে সে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং ধীরে ধীরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তার কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, কৌতূহল প্রবৃত্তি, চিন্তন ক্ষমতা, মনোযোগ প্রভৃতি প্রবৃত্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

প্রাক্ষোভিক বিকাশে : শিশু খাদ্য, নিরাপত্তা ও যত্ন থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর মধ্যে রাগ ও ভয় প্রবল মাত্রায় বিকশিত হয়। ভালোবাসার প্রক্ষোভটি অবলুপ্ত হয়ে যায়। তার ব্যক্তিত্বের বিকাশও সঠিকভাবে হয় না। স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হয় না। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে মানসিক অসুস্থতাও দেখা দেয়।

সামাজিক বিকাশে : শিশু পরিবারের মা-বাবা এবং অন্য সদস্যদের মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। শিশু অন্তর্মুখী হয়ে পড়ে, সবার সঙ্গে মেলামেশা করতে পারে না এবং অনেকসময় সমাজের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণ্য তৈরি হয় যার জন্য অনেক শিশু কৈশোরে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।


[উ] যে মানব বিকাশের নীতিগুলি হল-

বিকাশ ধারাবাহিকতা মেনে চলে : সমস্ত শিশুর বিকাশের মধ্যে সদৃশ ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সব শিশুই হাঁটার আগে দাঁড়ায়, চতুর্ভুজ অঙ্কন করার আগে বৃত্ত অঙ্কন করে। কোনো ক্ষেত্রেই এর বিপরীত ঘটে না।

বিকাশ সামগ্রিক থেকে বিশেষের দিকে অগ্রসর হয় : মানসিক এবং চলন প্রক্রিয়ার বিকাশ প্রথমে সামগ্রিক পরে বিশেষের দিকে হয়। যেমন শিশু প্রথমে কোনো বস্তু ধরতে গেলে সমগ্র হাত ব্যবহার করে পরে সে প্রয়োজনীয় আঙুলগুলি ব্যবহার করে বস্তুটি ধরে। প্রাক্ষোভিক আচরণের ক্ষেত্রে একইভাবে শিশু প্রথমে কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তি বা বস্তু দেখলেই ভীত হয়। পরে তার এই ভীতিভাব নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তুর প্রেক্ষিতে দেখা যায় এবং ভয়ের প্রতিক্রিয়াগুলিও নির্দিষ্ট প্রকৃতির হয়। যেমন-ক্রন্দন, স্থান পরিত্যাগ করা বা লুকিয়ে পড়া বা দাঁড়িয়ে থেকে ভয় পাইনি এমন ভাব দেখায়।

বিকাশ উপর দিকে শুরু হয়ে নীচের দিকে ঘটে : বিকাশ উপর দিক থেকে অর্থাৎ মস্তিষ্ক থেকে শুরু হয়ে ক্রমশ নিম্নে অগ্রসর হয় একেই Cephalocaudal নীতি বলে।

বিকাশ সম্পর্ক যুক্ত : আমাদের অধিকাংশের মধ্যে একটি বিশ্বাস দেখা যায় যে, প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য হল ক্ষতিপুরণ করা, যেমন-অন্ধদের শ্রবণশন্তি তীক্ষ্ণ হয়, মেধাবী শিশু বুগণ হয় ইত্যাদি কিছু এই বিশ্বাস পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। Terman এবং Oden জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন যে বাঞ্ছিত সংলক্ষণগুলি একই দিকে অগ্রসর হয়। বুদ্ধি এবং আকার, শক্তি, শারীরিক সক্ষমতা এবং প্রাক্ষোভিক স্থিরতার মধ্যে কোনো ঋণাত্মক সম্পর্ক দেখা যায়নি। তারা আরও মন্তব্য করেছেন যে, বিভিন্ন দিকের বিকাশের মধ্যে ধনাত্মক সম্পর্ক বর্তমান। যখন শারীরিক বিকাশ দ্রুত ঘটে মানসিক বিকাশও দ্রুত হয়। যেমন-যখন দেহের আকার, উচ্চতা এবং দেহের অনুপাত বৃদ্ধি পায় তখন স্মৃতি, কারণ নির্ণয়, অনুষঙ্গের ক্ষমতা এবং অন্যান্য মানসিক ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে।

বিকাশের ধারার মধ্যে স্থিরতার নীতি : যদিও শিশুদের মধ্যে বিকাশের হারের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায় তবে সব শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে স্থিরতা দেখা যায়। এর অর্থ হল প্রতিটি শিশুর বিকাশের মধ্যে নিজস্বতা পরিলক্ষিত হয় যা নিয়ন্ত্রিত হয় শিশুর বংশধারা এবং পরিবেশের অনন্য সমন্বয়ের দ্বারা। সমীক্ষায় দেখা গেছে মেধাবী গড় এবং অল্পধী শিশুরা বরাবরই যথাক্রমে মেধাবী গড় এবং অল্পধী হয়।

বিকাশ কেন্দ্র ক্ষেত্রে পরিধির দিকে অগ্রসর হয় : বিকাশের অন্যতম নীতি হল নিকট থেকে দূরে অগ্রসর হওয়া অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে ক্রমশ পরিধির দিকে এগিয়ে যাওয়া। একেই ‘Proximodistal Law’ বলে।


সেমিস্টারের অন্যান্য লেখা